জলবায়ু সম্মেলনে ক্ষতিপূরণের দাবিতে বাংলাদেশের প্রস্তুতি কতটা
জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ, বিশেষ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের উপকূলীয় এলাকা প্রতি বছর ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদী ভাঙনের কারণে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির কীভাবে মোকাবিলা করা হবে এবং উল্লেখযোগ্য ক্ষতিপূরণ আদায় করা সম্ভব হবে কি না—এই প্রশ্ন সামনে রেখে বাংলাদেশ অংশ নিচ্ছে আগামী ১০ নভেম্বর ব্রাজিলের বেলিম শহরে শুরু হতে যাওয়া বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩০-এ।
১৯৮টি দেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে এই সম্মেলনে জলবায়ু অর্থায়ন, কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষতিপূরণ ইস্যু নিয়ে বিস্তর আলোচনা হবে। বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট দফতর ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও দাবিনামা চূড়ান্ত করেছে। সম্মেলনে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতার বিশেষ উপস্থাপনাও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের ১১টি উপজেলার অন্তত ১০ হাজার পরিবার উপকূলীয় এলাকায় বাড়ি হারিয়ে কাজ ও মাথা গোঁজার আশায় শহরমুখী হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মমতাজ বেগম জানান, ‘গত ১০ বছর ধরে দেখছি, প্রতি বছরই ঝড় হচ্ছে, প্রতি ঝড়েই আমাদের বাড়ি ঘর ভেঙে নদীতে বিলীন হয়ে যায়। আগে যে ফসল উৎপাদন করতাম, তা এখন অর্ধেকে নেমে এসেছে। আমাদের এলাকায় লবণ পানির সমস্যাও প্রকট। খাবার পানির জন্য যেতে হয় দুই মাইল দূর পর্যন্ত।’ শিখা রানী নামের অপর এক বাসিন্দা জানান, এলাকার বাড়িঘর হারিয়ে প্রতি বছরই মানুষ শহরে চলে যাচ্ছে। কাজের অভাব আর ফসল না হওয়ায় তাঁদেরও এলাকা ছাড়তে হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সংবেদনশীল এই উপকূলীয় অঞ্চলের ফসল উৎপাদন, জমি ও পানি সংকট যেমন বাড়ছে, তেমনি মানুষের জীবনধারাও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ ৩.২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে, যার জন্য দায়ী করা হয় কার্বন নিঃসরণকারী উন্নত দেশগুলোকে। আর ঠিক এ কারণেই আসন্ন কপ সম্মেলনে এ ক্ষতির উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের দাবিতে জোরালোভাবে অংশ নিতে চায় বাংলাদেশ।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাওসেডের নলেজ ম্যানেজমেন্ট টিম লিডার সালাহ উদ্দিন বলেন, ‘এবারের সম্মেলনে আমরা চাই ক্ষতিপূরণ ও অভিযোজন তহবিলের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে। আমাদের তরুণ কর্মীরা জোরালো প্রস্তুতি নিয়েছে। তবে আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন এবং নেগোসিয়েশনে লবিং করা।’ তিনি আরও বলেন, ক্ষতিপূরণ হিসেবে এখন যা পাওয়া হয়, তা দাবির তুলনায় অনেক কম, তার ওপর তা লোন আকারে আসে; অথচ এই অর্থ গ্রান্ট হিসেবে পাওয়া উচিত ছিল। তাই এবার এ দাবিটিকে আরও জোরালো করার পরিকল্পনা রয়েছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. নাজমুস সাদাত মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং উপকূলীয় অঞ্চলের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরতে গবেষণাধর্মী প্রমাণাদি অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অনেক ঘাটতি আছে বলে তিনি জানান।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বলেন, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দাবিসমূহ স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়াই তাঁদের লক্ষ্য এবং সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
আগামী ১০ নভেম্বর শুরু হয়ে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে এই ১১ দিনব্যাপী বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলন। সম্মেলনটি বাংলাদেশের জন্য উপকূলের ক্ষতি, বাস্তুচ্যুতি এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

Post Comment